ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ , ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরগুনায় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ চুল্লি'র ১০টি ‘মরন ফাঁদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০১-১৭ ২০:৫৪:১৪
বরগুনায় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ চুল্লি'র ১০টি ‘মরন ফাঁদ বরগুনায় প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ চুল্লি'র ১০টি ‘মরন ফাঁদ

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

বরগুনার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠীতে অবৈধ কাঠের চুল্লি ঘিরে নেমে এসেছে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়। কয়েক বছর আগে মাত্র তিনটি চুল্লি স্থাপন করলে স্থানীয়দের অভিযোগে তা ভেঙে দেয় প্রশাসন। কিন্তু পরে আইনকে তোয়াক্কা না করে এবং প্রভাব খাটিয়ে ‘মৃত’ চুল্লিগুলো ফের জেগে ওঠে। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০টি—যা স্থানীয়রা আখ্যা দিচ্ছেন “মৃত্যু কারখানা” হিসেবে।


কয়লা উৎপাদনের নামে এসব চুল্লি থেকে দিনরাত শতশত মন কাঠ পুড়িয়ে বন ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। চুল্লি থেকে সারাদিন–সারারাত ঘন কালো ধোঁয়া উঠছে। পুরো গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র বিষাক্ততা। ফসল, গাছপালা, পশুপাখি-সবই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৌসুমি আমসহ বিভিন্ন ফলজ গাছে এখন ফুল–ফল থাকার কথা; কিন্তু বাস্তব দৃশ্য ভিন্ন। আমের মুকুল শুকিয়ে যাচ্ছে, ফল ঝরে পড়ছে, শাকসবজি ধূসর হয়ে পুড়ে যাচ্ছে, ধানের দানা কমে যাচ্ছে।


কৃষক আবুল কালাম বলেন, চুল্লি থাকলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব না। ধোঁয়া এসে পাতাসহ গাছ পুড়ে মারা যাচ্ছে।” শিশু–নারী–বৃদ্ধ সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ধোঁয়ায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে-শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালা, মাথা ব্যথা, বমি এবং তীব্র অ্যালার্জি।


গৃহবধূ শিরিন আক্তার ময়না বলেন, রাতে বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে থাকা যায় না। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। অভিযোগ করলেই হুমকি আসে।”


স্থানীয় প্রবাসী (মালয়েশিয়া) সবুজ বলেন, “তিনটা চুল্লি ভেঙে দেওয়ার পর ভেবেছিলাম শান্তি পাবো, এখন তো দশটা! অভিযোগ করলে চাঁদাবাজি মামলা আর প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরিবার নিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছিল।


বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আবুল ফাতাহ বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির চুল্লির ধোঁয়া অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে থাকা কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই–অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ফর্মালডিহাইড ও কালো কার্বন খুব দ্রুত শ্বাসতন্ত্রে ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। চোখের জ্বালা, মাথা ঘোরা ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন কম পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। “যত দ্রুত সম্ভব এসব চুল্লি বন্ধ করা জরুরি,” জানান তিনি।


স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় রাতারাতি এসব চুল্লি গড়ে ওঠে। কেউ প্রতিবাদ করলেই ধাওয়া, হুমকি, চাঁদাবাজি মামলা এবং মরদরের ভয় দেখানো হয়। অভিযান এক–দুবার হয় বটে, কিন্তু টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।


মালিকদের অবৈধ স্বীকারোক্তি-অদ্ভুত যুক্তিও দিয়েছেন, চুল্লির মালিক কবির মৃধা স্বীকার করেন, চুল্লির কোনো অনুমোদন নেই।


চুল্লির মালিক মাসুদ ফিটার জানান, পরিবেশ অধিদপ্তরে ঘুরে জানতে পেরেছি, এটি বিড়ি–সিগারেটের মতো-না একদম বৈধ, না একদম অবৈধ; মাকরূহ। এতে পরিবেশের ক্ষতি হয় না।”

স্থানীয়রা বলছেন, দোষ স্বীকার করেও তারা দাপটের সঙ্গে চুল্লি চালাচ্ছেন-কারণ তাদের রয়েছে শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতা।


বরগুনা সদর থানার ওসি মো. আবদুল আলীম বলেন, বাবুগঞ্জ ফাঁড়িকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব জানান, আগামী ৩–৫ দিনের মধ্যেই সকল অবৈধ চুল্লি ভেঙে ফেলা হবে। আবার তৈরি করলে মামলা করা হবে। আগের একটি মামলাও চলমান আছে।”


অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল বলেন, যত ক্ষমতাবানই হোক-অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে অভিযান হবেই।”


পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আজগরকাঠীর চুল্লিগুলো তাই সরাসরি আইন লঙ্ঘন করছে।


চরম ঝুঁকিতে পরিবেশ ও মানুষের জীবন সচেতন মহল বলছে, যদি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এ এলাকা অচিরেই স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ফসল, জনস্বাস্থ্য, মাটি ও বায়ুমণ্ডল সবই এখন চরম ঝুঁকিতে। স্থানীয়রা তাই দ্রুত অভিযান, সব চুল্লি বন্ধ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।


 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ